সাদিয়া সিদ্দীকা ।। চিঠি

1

আর্টওয়ার্ক: নগরবাসী বর্মন

কল্যাণীয়েষু,

“এখন তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ, পত্র দিও” কবিতার চরণটি ইদানিং মনকুঠুরির তানপুরায় নতুন সুর তুলছে। যদিও আমি জানি আপনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন। তবুও এক এক সময় নিবিড় বেদনাময় উদগ্র অতৃপ্তির বীণ বেজে ওঠে কেননা বাহ্যিক নয় আপনার অন্তরের খবর জানতে চাই। আপনি তো জানেন বরাবরই আমি এমন, একটু বাড়তি অধিকার চর্চা, আগ্রহ, শ্রদ্ধা, ভালো লাগা, ভালোবাসা আপনার প্রতি। আর এ থেকেই তো না চাইতেও হৃদয়ে এক মরণব্যাধির বাসা বানিয়ে বসলাম।

আপনি কবি, মনের মানুষ। আপনার কন্ঠে যে কবিতা শোনার ব্যাখ্যাতীত আকাঙ্ক্ষা তা আমার কখনোই মিটতো না বলেই হয়তো ইশ্বর আমাদের এক করেননি। তাই  ক্ষণিককালের উত্তুঙ্গ প্রেমে বিশাল হৃদয় সমুদ্র থেকে যে এক বিন্দু জল আঁজলা ভরে পান করতে পেরেছি তাতেই ধন্য। এ জল পান করার সুন্দর মূহর্ত গুলো আপনি তো নয়ই  মহাকাল ও আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবেনা এইটুকুই স্বান্তনা। কতটুকু পেয়েছি কতটুকু পাইনি এ হিসেব আমি করতে বসিনা কখনো। বরং এ না পাওয়ার বেদনা আমার পরম পাওয়া, এ অতৃপ্তিই ক্ষণস্থায়ী জীবনের পরম আরাধ্য। নিয়তিকে মেনে নিয়েছি বলেই বিচ্ছেদ ভাঙতে কখনো কোন বার্তা আমি পাঠাইনি। মনে মনে আওড়েছি, “আমি কি ভুলেও কোন দিন এসে দাঁড়িয়েছি তব দ্বারে?” বরং আপনার অবহেলা, উপেক্ষা, অপবাদ প্রসূত হৃদয়ের যে ক্ষত তা শিউলি ফুলের প্রেমার্ঘ্য রূপে মাথা পেতে নেওয়াতেই আমার আনন্দ জেনেছি। আর আপনার আমার মধ্যকার অসীম ব্যবধান তা আমার দুঃখবিলাস, তা আমার অমোঘ নিয়তি।

একটা বিষয় না লিখে পারছিনা, গত চার রাত ধরে আমি স্বপ্নে আপনার অর্ধাঙ্গিনীকে দেখছি, না একটু ভুল হলো আপনাদের দুজনকেই দেখছি। কেন দেখছি এর কোন ব্যাখ্যা পাচ্ছি না, আমি তো কখনো আপনাদের দুজনকে একত্রে ভাবিনা। তবুও কেন এমন এমন অদ্ভুত স্বপ্ন আসে। অদ্ভুত বলছি কারণ আপনাদের সাথে সেখানে আমিও থাকি, না কারও প্রতিপক্ষ হিসেবে নয় কল্পিত মিত্রতার সূত্র ধরেই আর স্বপ্নটা ঠিক যেখানে ভেঙে যায় পরেরদিন ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়। স্বপ্ন দেখি বলে আমার একটু ও আক্ষেপ নেই, কিন্তু বিপত্তি বেঁধেছে অন্য জায়গায় এ স্বপ্ন দেখার পর আর কিছুতেই ঘুম আসেনা। স্লিপিং ড্রাগ এক ডোজ গিলে নিলেও না, আমার তো মনে হয় স্বয়ং আজরাইল এসেও ঘুম পাড়াতে পারবেনা। নিশাচরের মতো আমি ধীরে ধীরে নিশীথ  আধাঁর কেটে আলো ফুটতে দেখি। আমার সীটের পাশেই বড় একটা জানালা, সব রোগীদের ঘরে থাকেনা এখানে আমার ভাগ্য খেলে গেছে বলতে পারেন। সেই গারদের মতো ঘরেও জানালার ছোট ছোট সবুজ ঘাসফুল আঁকা পানসে দুধ সাদা রঙের পর্দার ফাঁকে মিষ্টি সকাল উঁকি দেয় তখন আমার সে রাতের কথা মনে হয়। ওই আমার জীবনে বহু প্রতীক্ষিত এক রাতের কথা। মনে আছে? আপনার কাছে আমার একটাই আবদার ছিলো একসাথে এক রাত জাগার প্রতিশ্রুতি। গভীর নিশীতে হঠাৎ বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে যে এক অদ্ভুত হিম ভেজা আধাঁর মুখ তুলে চারিদিকের কোলাহলকে গ্রাসকরে, ছড়িয়ে দেয় শুনশান নীরবতা তখন আমার কর্ণগুহরে চুপিচুপি প্রতিধ্বনি তুলে আজও সেই কথাটা। কোনো নতুন কথা নয় তবুও চিরনতুন, চিরকালীন । ভালোবাসাময় আবেগ সিক্ত কন্ঠে পরপর তিনবার উচ্চারণ করেছিলেন “ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি আপনাকে।…….আপনার থেকেও বেশি। “আপনার ও মনে আছে নিশ্চয়ই। তারিখটা ছিলো ১৬ নভেম্বর….. অতঃপর আপনার পূর্বপরিকল্পিত এক বালির ঝড়ে ২২ নভেম্বর সমস্ত সুন্দরের সমাপ্তি।

যা হোক, পুরনো কথা আওড়ে কি হবে। নতুন কথা বলি, কথা তো নয়, শুধু জানতে চাওয়া। আমার প্রতি রাগ ক্ষোভ ঘৃণা যা ছিলো তা কি আমাকে কথার বাণে বিদ্ধ করা, চূড়ান্ত অপমান করার পর কিছুটা কমেছে নাকি কম্পাসের কাঁটার মতো একইদিকেই ঘুরে যাচ্ছে? যদি এখনো কিছু বাকী থেকে থাকে তা গ্রহণ করার অভিপ্রায়ে আপনি ডাকলেই এ অবিশ্বাসী আপনার সম্মুখে নয়ন তুলে দাঁড়াতে পারার সৎ সাহস রাখে। 

শুনেছি আপনি বিয়ে করেছেন, না ঠিক শুনা নয় দেখেছি নিজ চোখে আপনার শুভ পরিণয়ের স্থিরচিত্র। একটা টুকটুকে লক্ষ্মী প্রতিমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছিলেন। আপনার বাহু লগ্ন হয়ে ছিলো তার কাঁধ। কাউকে হারিয়ে নিজে জিতে যাওয়ার একটা আবেগময় চাপা উচ্ছ্বাস ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলো আপনার চোখ মুখের দীপ্তিতে। তবে জানেন, ওইদিন সন্ধ্যা থেকে কেন জানি বারবার মন ডাকছিল, এমন একটা সুসংবাদ পাব। সন্ধ্যা পেরিয়ে মধ্যরাত ও হয়নি সবে আটটা কুঁড়ি বেজেছিলো আমার মেসেন্জারে টুং করে একটা শব্দ হলো আর তারপর সেই দুটি চিত্র। আমি এলিয়ট রেখে আপনার লাজুক হাসিতে বুঁদ হয়ে থাকলাম সারারাত। যদিও আমি বারবার শপথ করছিলাম, কনফিডেন্স রাখার চেষ্টা করছিলাম এর প্রভাব আমার জীবনে কোথাও পড়বেনা কিন্তু শেষ রক্ষা হলোনা। 

আপনার প্রতি কোন অভিযোগ নেই, অভিমান ও নেই। রাগ ঘৃণা শব্দ দুটো আপনার জন্য বরাদ্দ নয়। চিরকাল মহৎ বলে জেনে এসেছি ও আসন থেকে চাইলেই নামাতে পারিনা। মানুষ তো কত কিছুই বলে, আর অপর পক্ষকে শুনতে হয়। আমার সম্পর্কে আপনার যে ধারণা আমিও তা মানুষের মারফত শুনেছি। ওখানেও কিছু বলার নেই, আপনি নিজে যেটা স্বীকার করেছেন, উচ্চারণ করেছেন সেটা মিথ্যে প্রমাণ করার ইচ্ছে আমার নেই। আমি শুধু জানি মহাকাল যে ক্ষুদ্র সময়টুকু জীবন বলে আমাদের দান করেছেন, সেটা অন্যের অনিষ্ট করবার জন্য নয়, ভালোবেসে একে অপরের কল্যাণে পুষ্পবৃষ্টি আনার জন্য। 

আপনি বিশ্বাস করেন, এই নববর্ষার বৃষ্টিসিক্ত নিশীতে বসে আমি যা লিখছি তা সত্য। বহুকাল আগে যে বর্ষার আঁধারে লুকিয়ে সিক্ত বসনে রাধা কৃষ্ণ অভিসারে যেতো সেই বর্ষায় আজ আমাকে এ পত্র লিখতে ইন্ধন যুগিয়েছে। আমার অন্তর্যামী জানেন, যে অপরাধে আমাদের চিরবিচ্ছেদ ঘটল সে অপরাধ দিয়েই আপনাকে আরও কাছে টানতে চেয়েছিলাম। ধারণা ছিলো আপনি হয়তো ঈর্ষাকাতর হয়ে হলেও বা আমাকে হারানোর ভয়ে হলেও ফিরবেন। কিন্তু না তার কোনটাই হয়নি যা হয়েছে তার জন্য আপনাকে দায়ী করা চলেনা। আমাকেও না…তবু ক্ষমা নেই আমার– কেননা চিরকাল নারীদের ভালেই লেপ্টে থাকে দোষীর তিলক, লোভীর তকমা। প্রার্থনা করি সুখী হোন, শান্তি পান, চুমুকে পান করুন আপনার প্রত্যাশিত স্বচ্ছল নিরুদ্বিগ্ন জীবনের অমৃত। আমার অন্তর্যামী জানেন, একটি কথাও মিথ্যে বলছি না, আপনার প্রতি কোন অশ্রদ্ধা নেই, আপনাকে সাফল্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে দেখার বাসনা এখনো এই হৃদয় মন্দিরে জ্বলজ্বল করছে।

আজ আপনার কথাটা আপনাকেই ফিরিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে, “আপনি আমার সারাজীবনের কান্না হয়ে বেঁচে থাকবেন।” আপনাকে দুঃখ জাগানিয়া মনের মানুষ বলে স্বীকার করেই বিষাদের নীল হেমলকে আত্মাহুতি দিয়েছি। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে সাক্ষী রেখে ফিনিক ফোটা পূর্ণিমা রাতে শুধু একটা কথা চিৎকার করে জানাতে ইচ্ছে করে, হে আমার দুঃখ জাগানিয়া, তুমি আমাকে যতটা অবিশ্বাসী ও মন্দ বলে বিশ্বাস করো আমি ততটা অবিশ্বাসী বা মন্দ নই।

ইতি,

আপনার শুভার্থী

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহ করে এখানে আপনার নাম দিন